অ্যালকোহলে বুঁদ ক্রিকেট প্রতিভা

শৈশবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ। তারপর থেকেই শুরু একলা চলো জীবন। কৈশোরটা কেটেছে বন্ধুদের সঙ্গে। রাতটা আজ একজনের বাড়িতে, তো কাল অন্যজনের। বাবা-মায়ের পরিত্যক্ত ছেলেটি বড় হয়েছে পোষ না মানা বন্য মৃগশাবকের মতো। যার প্রভাবই হয়তো দেখা গেছে তার পরবর্তী জীবনেও। বলা হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের আলোচিত-সমালোচিত ক্রিকেটার জেসি ড্যানিয়েল রাইডারের কথা।

২০০২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের দলে ডাক পেয়ে যান। পরের বছর সেন্ট্রাল ডিসট্রিক্টের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রাখেন। পরের মৌসুম থেকে ২০১৩ সালে পর্যন্ত টানা খেলেছেন ওয়েলিংটনের হয়ে। ঘরোয়া লিগে তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্য নজর কাড়ে নির্বাচকদের। ২০০৮ সালে ঘরের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলে ডাক পেয়ে যান জেসি। তখন জাতীয় দলের নির্বাচক ম্যানেজার রিচার্ড হেডলি জেসির ট্যালেন্ট নিয়ে প্রশংসা করেছিলেন একেবারে খোলামুখে। তবে জেসিকে দলে রাখায় কড়া সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় হেডলিকে। এ ক্ষেত্রে জেসির প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায় নিজের স্থূল শরীরটা। সাবেক ক্রিকেটার অ্যাডাম পেরোরে বলেছিলেন, ‘জেসি অনেক মোটা। সে নিউজিল্যান্ড দলে খেলার মতো ফিট না।’

অভিষেক সিরিজে অসাধারণ কিছু করতে না পারলেও দৃষ্টিনন্দন অলরাউন্ড নৈপুণ্যে সমালোচকদের মনে দাগ কটতে সক্ষম হন। পাঁচ ওয়ানডেতে করেন ১৯৬ রান। দ্বিতীয় ম্যাচে ৭৯ রান করে হন ম্যাচসেরা। নিউজিল্যান্ডের পরবর্তী সূচিতে দীর্ঘ সময়ের জন্য তাঁকে বিবেচনা করা হবে তেমনটাই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু বিধিবাম! বলতে গেলে সুযোগটা নিজের হাতেই ধ্বংস করলেন জেসি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পরের রাতভর মদ পান করলেন। সকাল সাড়ে ৫টায় ক্রাইস্টচার্চে একবার টয়লেটে জানালার কাচে হাত কেটে ফেললেন। পরে জানা যায়, শেষ ওয়ানডের আগের রাতেই মদ পান করেছিলেন জেসি, যে ম্যাচে ২৪ রান করেছিলেন তিনি। এই ইনজুরি তাঁর টেস্ট অভিষেক পিছিয়ে দেয় সাত মাস। সে বছর অক্টোবরে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিপক্ষে সাদা জার্সি গায়ে জড়ান জেসি।

২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডের পর আবার রাতভর মদপানের পর সকালে টিম মিটিংয়ে হাজির হতে পারলেন না, এমনকি বিকেলে দলের অনুশীলনেও এলেন না। বাদ পড়ে গেলেন চতুর্থ ওয়ানডের দল থেকে। এত কিছুর পরও কোনো ঝামেলা ছাড়াই সে বছর ভারতের বিপক্ষে তিন ফর‍ম্যাটেই দলে রাখা হয় জেসিকে। বোর্ডের আস্থার প্রতিদানও দিলেন দারুণভাবে। পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের দলের সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন তিনিই। ৫৬.২৫ গড়ে করেন ২২৫ রান। তৃতীয় ম্যাচে করেন ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি। একমাত্র জয় পাওয়া পঞ্চম ম্যাচে বোলিংয়ে ৩-২৯ এবং ব্যাটিংয়ে ৬৩ করে হন ম্যাচসেরা। হ্যামিলটনে প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় টেস্টে খেলেন ক্যারিয়ার-সেরা ২০১ রানের ইনিংস। নাথান অ্যাশলের পর জেসিই প্রথম কিউই ব্যাটসম্যান, যিনি পরপর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন।

একই বছর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচে পায়ের পেশিতে ইনজুরির পরেও খেলেন ৭৪ রানের দারুণ ইনিংস। তবে আউট হয়ে ফেরার সময় ব্যাট দিয়ে চেয়ারে আঘাত করে জরিমানা গুনতে হয় ম্যাচ ফির ১৫ শতাংশ। শুধু তাই নয়, টিম ম্যানেজার ডেভ কুরির সঙ্গে অসদাচরণের জন্য দেশে ফিরে শুনানির মুখোমুখি হতে হয় জেসিকে। তবে শাস্তিটা গোপন রাখা হয়।

সে বছর অক্টোবরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১২ বলে ৩১ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলার পথে কুচকির ইনজুরিতে পড়েন। শেষ হয়ে যায় বিশ্বকাপযাত্রা। আবার ক্রিকেটের বাইরে প্রায় সাত মাস। ২০১০ সালের এপ্রিলে প্রথম শ্রেণিতে ওয়েলিংটনের হয়ে মাঠে নেমেই খেলেন ১০২ রানের অনবদ্য ইনিংস। সে বছর শ্রীলঙ্কা আগস্টে শ্রীলঙ্কা সফরে ডাক না পেলেও খবরের শিরোনামে আসেন বাজেভাবে। অবৈধ মাদক গ্রহণের জন্য অভিযুক্ত হন জেসি।

২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সবশেষ টেস্ট খেলেছিলেন এ বাঁহাতি। এরপরের বছর মার্চে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে একধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান। গোটা বছর প্রথম শ্রেণিতে দারুণ ফর্মে থাকার পরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার জন্য প্রস্তুত নন বলে জানান জেসি।

২০১৩-১৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে দলে ফেরেন। সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে কোরি অ্যান্ডারসনের সঙ্গে জুটি বেঁধে ঝড় তোলেন। শহিদ আফ্রিদির দীর্ঘ ১৭ বছরের রেকর্ড ভেঙে ওয়ানডেতে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন অ্যান্ডারসন (৩৬ বলে)। পরে অবশ্য এক বল কম খেলে এ রেকর্ড ভেঙে দেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। এদিকে সপ্তম দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন জেসি (৪৬ বলে)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পর আবারও অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য অভিযুক্ত হন জেসি। তবে সে যাত্রায় কিউই ক্রিকেট বোর্ড তাঁর বিরুদ্ধে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বরং ভারতের বিপক্ষে দলে রাখা হয় তাঁকে। পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের একটি ইনিংসেও ২০ রান টপকাতে পারলেন না জেসি। বাদ পড়ে যান টেস্ট সিরিজের দল থেকে।

মার্চে ক্রাইস্টচার্চে একবার বাইরের ‘মারামারি’তে জড়িয়ে মাথায় আঘাত নিয়ে কোমায় চলে যান রাইডার। সঙ্গে নিয়ে যান বাংলাদেশে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন। মৃত্যুকে জয় করে ফিরেছেন ঠিকই তবে জাতীয় দলের জার্সি আর গায়ে তুলতে পারেননি। ১৮টি আন্তর্জাতিক টেস্টে ৪০.৯৩ গড়ে করেছেন এক হাজার ২৬৯ রান। তিন সেঞ্চুরি আর ছয়টি হাফসেঞ্চুরি। ৪৮ ওডিআইতে ৩৩.২১ গড়ে এক হাজার ৩৬২ রান, তিন সেঞ্চুরি এবং ছয় হাফসেঞ্চুরি। টি-টোয়েন্টিতে মাঠে নেমেছেন ২২ বার ২২.৮৫ গড়ে করেছেন ৪৫৭ রান। প্রথম শ্রেণিতে ১২৪ ম্যাচে আট হাজার ১৪৪ এবং লিস্ট ‘এ’তে ১৬৯ ম্যাচে পাঁচ হাজার ২৯৮ রান। বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি লিগে খেলেছেন ১৩৪টি ম্যাচ, করেছেন তিন হাজার ১৫৪ রান। নামের পাশে আছে ১৯টি আন্তর্জাতিক উইকেট। বর্তমানে প্রথম শ্রেণিতে এসেক্স এবং সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন।

নিজের দিনে যে কোনো দলের বোলিং লাইন আপকে শাসনের ক্ষমতা রাখেন জেসি। স্থূল শরীর নিয়েও ফিল্ডার হিসেবে তিনি অসাধারণ, বিশেষ করে গালিতে তিনি ছিলেন স্পেশালিস্ট। অ্যালকোহলে আসক্তি আর নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন। শত বিপত্তির পরও বারবার ফিরে এসেছেন, মেলে ধরেছেন নিজের মেধা আর সক্ষমতাকে। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম কিংবা রস টেলরের মতো হয়তো বড় বড় ইনিংস নেই, তবে জেসির চিত্তাকর্ষক ব্যাটিং বরাবরই দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। বহু অ্যাথলেট ক্রীড়াজগৎ রাঙিয়েছেন। বহু ক্রিকেটার মাতিয়েছেন গ্যালারি। তবে খেয়ালি, অভিজাত আর উচ্ছন্ন ব্যাটিংয়ে ক্রিকেট ক্যানভাস আলোকিত করা ব্যাটসম্যান সম্ভবত একজনই। শুভ জন্মদিন জেসি।

loading...