আমেরিকান স্বপ্নে

সাংবাদিক হান্টার এস থম্পসন ১৯৬৮ বলেছিলেন আমেরিকান স্বপ্নের মৃত্যু। কিন্তু আমেরিকান স্বপ্ন কী ছিলো? কি সেই বস্তু যা এটিকে আমেরিকান বানিয়েছে?

কিছু মানুষের জন্য এই স্বপ্ন হচ্ছে আমেরিকানদের বিশ্বাস, যে তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে সম্পদ আছে তাতে অর্থনৈতিকভাবে অন্যদের থেকে জীবনযাত্রার মান আরও বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু, মার্কিনীরা ১৭শ সালে যে পরিমাণ শ্রমিকদের মজুরি দিত সেই পরিমাণ মজুরি ব্রিটেন দিত ১৮৮০ সালে। পরে মজুরির এই পার্থক্য জার্মানি ১৯১৩ সালে এবং ১৯৭০ সালে ফ্রান্স কমিয়ে আনে।

কিছু অর্থনীতিবিদের কাছে স্বপ্নটি মূলত ছিল জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা, উন্নতি করার স্বপ্ন। অর্থনীতিবিদ রাজ চেটি মানুষ তাদের বাবা-মার থেকে কতটা উন্নত হতে পারলো তা মেপে দেখেছিলেন। তিনি দেখেন, ১৯৪০ সালে ৯০ শতাংশ তরুণ মার্কিনীরা তাদের বাবা-মার থেকে অধিক আয় করতেন। এ হার মার্কিনীদের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করেছিল। যার ফলে মজুরির হারও বেড়ে যায়। ১৮৯০ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সে উৎপাদনের হার স্বাভাবিক ছিল। যা ১৯৪৫-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একই রকম ছিল। যদি আমেরিকান স্বপ্ন হয় উন্নয়ন তবে ইউরোপীয়রাও এই উন্নয়নের ম্বপ্ন দেখতেই পারে।

অনেকের কাছে এই স্বপ্ন হলো সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য সকলের সঙ্গে মিলে যাওয়া। যেমনটা করতে চেয়েছিলেন এলিনিয়র রুজভেল্ট, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, জন রলস ও রিচার্ড ররটি। অন্তর্ভূক্ত হওয়ার স্বপ্ন ছিলো এটি। যদিও এটা মার্কিন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণের কাছে আলাদা কিছু নয়। নিশ্চিতভাবেই আরব ও রোমারা ইউরোপের সমাজের সঙ্গে মিলে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে।

কিছু বিশেষজ্ঞরা যেমন-রিচার্ড রিভস ও ইসাবেল সহিলের কাছে এ স্বপ্ন হচ্ছে গতিশীলতার। মার্কিনীদের বিশেষ করে যারা দরিদ্র ও শ্রমিক তাদের আশা, এক সময় তারা সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠবে। তাদের আয় বাড়বে। আসলে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমেরিকায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে সেসময় সমাজে অনেকের উন্নতি হয়েছে আবার অনেকের পতন হয়েছে। মিউজিক্যাল চেয়ারের এই খেলাটা মার্কিনীদের কাছে নতুন ছিল। ১৮৮০ থেকে ১৯২০ সালে জার্মান ও ফ্রেঞ্চরা আবিষ্কার করে তাদের অর্থনীতি বিশ্বায়নে রূপান্তর হয়েছে।

আসলে আমেরিকান স্বপ্ন লটারিতে লাখ লাখ ডলার জেতা নয় বা জাতীয় বাজার বা সরকারী নীতির মাধ্যমে অকূল পাথার থেকে বাঁচা নয়। এটা আসলে কোনো কিছু অর্জনের আশা। কারো ব্যক্তিগত জ্ঞান সম্পর্কে জানা, কারোর অনুভূতির ওপর বিশ্বাস করা এবং অপরিচিত কোনো কিছুর ঝুঁকি নেয়া। এ্তেই প্রতিফলিত হয় মার্কিনীরা আসলে যে কোনো কাজে সাফল্যের অভিজ্ঞতাটাই নিতে চায়। এটা এমন সাফল্য যা গুরুত্ব বহন করে।

এর প্রমাণ পাওয়া যায় মার্কিন ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েনের গল্প দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিনে। ফিন চেয়েছিল সামনে থাকা অজানা ভূমিতে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে যেতে।

উনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত মার্কিনীরা মনটেগেইন, ভলটেয়ার ও হেগেলের মতো দার্শনিকদের কথা বিশ্বাস করে গেছে। সেটা হলো, এ পৃথিবীতে কর্মে বিশ্বাস করো ও চেষ্টা করো বাগানে গাছ জন্মাতে, নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকার পরিমাণ বাড়াতে নয়।

loading...