এরদোগান দিল্লি না ছাড়তেই কাশ্মীর সীমান্তে হত্যাযজ্ঞ, কী বার্তা দিচ্ছে মোদী সরকার?

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ভারত সফরে এসে কাশ্মীর ইস্যুতে বহুপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে মধ্যস্থতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেনে। এও বলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফেরও সদিচ্ছা আছে। কিন্তু ভারত এই প্রস্তাব  খারিজ করে দিয়েছে। প্রকাশ্যে অবশ্য ভারত এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।  তবে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ সূত্রের বক্তব্য, এর আগে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে আমেরিকার মধ্যস্থতার প্রস্তাব ভারত সরাসরি খারিজ করে দিয়েছিল। দিল্লির দাবি, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাশ্মীরের যে অংশ পাকিস্তান দখল করে রেখেছে, তা মুক্ত করার জন্য ভারত ইসলামাবাদের সঙ্গেই আলোচনা করবে। এ নিয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা চায় না দিল্লি। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এরগোদানের মন্তব্যকে কোনো রকম গুরুত্ব দিতে নারাজ।

মোদী-এরদোগানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যুতে আলোচনা যাই হোক না কেন, এরদোগান দিল্লি ছাড়তে না ছাড়তেই পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে মোতায়েনকৃত পাকিস্তানি সেনা শিবিরে সরাসরি হমলা করে ভারতীয় সেনা কম্যান্ডোরা। এ ঘটনায় ৭ পাকিস্তানি সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে বলে ভারতীয় সেনাবাহিনী দাবি করেছে।
এর আগে সোমবার জম্মু ও কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার কৃষ্ণা ঘাটি সেক্টরে নিয়ন্ত্রণরেখা ডিঙিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর হামলা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এ সময় দুই ভারতীয় জওয়ানের শিরচ্ছেদ করার পরে তাদের অঙ্গহানি করা হয় বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পরপরই ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অরুণ জেটলি সোমবার সন্ধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, শহিদ জওয়ানদের আত্মবলিদান বিফলে যাবে না। তার ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা আক্রমণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
এভাবে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা-সহিংসতা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদী সরকার শুধু এরদোগানের প্রস্তাব নাকচই করেনি সাথে সাথে একটা কড়া মেসেজও দিয়েছে যে- এ ব্যাপারে তারা কারো নাগ গলানো পছন্দ করেন না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সহজেই অনুমেয় কাশ্মীরের ইস্যুটি জিইয়ে রাখার ব্যাপারে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতই বেশি দায়ী।মূলতঃ ভারত চাচ্ছে না কাশ্মীর ইস্যুটি সহজে মিটে যাক।

সোমবারই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এরদোগানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু দিল্লিতে আসার ঠিক আগে প্রেসিডেন্ট এরদোগান যেভাবে কাশ্মীর ইস্যুতে বহুপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন ও পাকিস্তানের সদিচ্ছা আছে বলে তাদের দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, তা ভারতকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে বলে প্রচার করেছে দেশটির গণমাধ্যমগুলো।
তবে বিকেলে মোদি ও এরদোগান যখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন তখন তারা কেউ অবশ্য কাশ্মীর শব্দটি উচ্চারণও করেননি।
কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন,তুর্কী প্রেসিডেন্টের এই সফর থেকে ভারতের কূটনৈতিক অর্জন যে কিছু হবার নয়, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
দিল্লির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে একটি ভারতীয় চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তিনি কাশ্মীর প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা ভারতের কাছে একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল না।
তিনি সেখানে বলেন, ‘কাশ্মীরে এই রক্তপাত আমরা চলতে দিতে পারি না। চিরতরে এই সঙ্কটের সমাধানের জন্য আমরা বহুপাক্ষিক একটা সংলাপের সূচনা করতে পারি, তাতে তুরস্কও জড়িত হতে পারে। আর এতে ভারত, পাকিস্তান উভয়েরই লাভ হবে।’
‘আমার প্রিয় বন্ধু, প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আমার অনেকদিন ধরেই কথাবার্তা হচ্ছে। আমি খুব ভাল করে জানি তার সদিচ্ছা আছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবেও চান এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক।’
তুরস্ক বরাবরই পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ বলে পরিচিত, কিন্তু কাশ্মীর প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট এরদোগান যে প্রকাশ্যে এমন মনোভাব দেখাবেন তা ভারত ধারণা করতে পারেননি।
এই প্রসঙ্গটি সফরে আলোচিত হচ্ছে কি না, দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তার সরাসরি জবাবও এড়িয়ে গেছেন।
তবে দিল্লিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অশ্বিনী রায় বলছিলেন, কূটনৈতিক দিক থেকে এই সফরে ভারতের যে বিশেষ কিছু পাওয়ার নেই, তা পরিষ্কার।
তিনি বলছিলেন, ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খাতে হয়তো সহযোগিতা বাড়বে, কিন্তু এই সফরে রাজনৈতিক সংলাপের নিরিখে কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা আমি দেখছি না।’
‘তুরস্কে যে ধরনের সরকারই থাকুক, ভারতে বর্তমান সরকারে যে ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঝোঁক দেখা যাচ্ছে, তাতে এই মুহূর্তে ডিপ্লোম্যাটিক মাইলেজ পাওয়ার আশা নেই বললেই চলে।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর কাশ্মীর নিয়ে কোনো কথা বলেননি।
তবে এটুকু তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন কাশ্মীর ইস্যুর নিষ্পত্তিতে সন্ত্রাসবাদের ব্যবহার ভারতের পক্ষে কিছুতেই মানা সম্ভব নয়।
মোদি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিপদ ভারত ও তুরস্ক উভয়কেই দুশ্চিন্তায় রেখেছে। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং আমরা একমত হয়েছি যে কোনো কারণ বা কোনো লক্ষ্য, কোনো যুক্তি দিয়েই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করা যায় না।’
‘জঙ্গি নেটওয়ার্ক নির্মূল করতে, তাদের অর্থায়ন বন্ধ করতে, সীমান্ত-পারাপার বন্ধ করতেও আমরা একযোগে কাজ করবো’, জানিয়েছেন মোদি।
অর্থাৎ কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না-হলে পাকিস্তানকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই, প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে পাল্টা এই বার্তাই দিতে চেয়েছে ভারত।
যদিও এটা জেনেই, যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের বহুদিনকার আস্থা ও বন্ধুত্বের সম্পর্কে চিড় ধরানো যাবে না, মনে করছেন অধ্যাপক অশ্বিনী রায়।
তিনি বলছিলেন, ‘তুরস্ককে ওই বন্ধুত্ব থেকে দূরে সরিয়ে আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি না। তা ছাড়া কাশ্মীরে তো ভারত তো নিজেরাই দিন কে দিন তাদের অবস্থান হারাতে বসেছে। সংলাপ শুরু করাটা ভারতের মধ্যেই বেশ স্পর্শকাতর বিষয়, এবং ভারত বরাবরই বলে আসছে কাশ্মীর একটা দ্বিপাক্ষিক বিষয়, এখানে বাইরের লোকজন ঢুকবে না।’
‘তার কারণ হল আমাদের কারও সঙ্গেই তেমন বন্ধুত্ব নেই এখন – কাজেই বাইরের লোকজন ঢুকলে তো বিপদ। আমেরিকা ইদানীং অবশ্য ভারতের বন্ধু হয়েছে, কিন্তু কাশ্মীর প্রশ্নে তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের দোস্তি আরও অনেক পুরনো। চীনও পাকিস্তানের সঙ্গে আছে, তুরস্ক তো ছিলই। রাশিয়া নিয়েও বলা শক্ত, তারা এখনো ভারতের কতটা বন্ধু।’
ফলে ভারত যে কিছুতেই কাশ্মীর নিয়ে আলোচনাকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে চায় না, তার কারণ বোঝা শক্ত নয়।
ভারতের জনমতও বিশ্বাস করে এটা ভারত-পাকিস্তানের ব্যাপার, কাশ্মীরে তৃতীয় কারও নাক গলানোর সুযোগ নেই।
তাই প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সফরের পর হয়তো ভারতে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়বে।কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে সেই বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হবে না।
loading...