সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেবেন খালেদা জিয়া

দলের আগামী ১৪ বছরের দলীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা নিয়ে আসছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আগামী মাসের প্রথম দিকেই আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা প্রকাশ করবেন তিনি। দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ আর বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণই হচ্ছে এর মূল লক্ষ্য। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে এ পরিকল্পনা বা ভিশনকে। এর মধ্যে থাকবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার কী ধরনের হবে তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শনিবার বলেছেন, এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। দ্রুত নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরবে বিএনপি। বিএনপি নির্বাচনে তখনই যাবে যখন সরকার নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করবে। আর আগামী সংসদ নির্বাচন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনেই হতে হবে।

জানা গেছে, সংবাদ সম্মেলনে আগামী ২০৩০ সালকে টার্গেট করে তৈরি করা দলীয় এই ভিশনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দেশের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, টেকসই গণতন্ত্র আর স্থিতিশীল অর্থনীতির ওপর। এ ছাড়াও নির্বাচনকালীন একটি ‘সহায়ক’ সরকার গঠনে সংবিধান সংশোধনীর প্রস্তাবও দিতে পারেন বেগম খালেদা জিয়া। আর নির্বাচনকালীন সেই নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো কী হতে পারে, তারও একটি ছক তুলে ধরা হতে পারে এতে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভিশন-২০৪১ সালকে চ্যালেঞ্জ করেই বিএনপির এই নতুন ভিশন তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এটি তৈরির কাজে সংশ্লিষ্ট দলীয় নীতিনির্ধারকদের সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা গেছে, ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তালিকা ছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবনাটি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হবে। সংবিধান সংশোধনীর প্রস্তাবে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের দেওয়া রায় অনুসারে বিগত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আলোকে আরেকটি নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা দাবি করে অন্তত আরও একটি মেয়াদে (একাদশ) জাতীয় নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণে আরও কিছু বিকল্প প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে। আবার নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের কথাও বলা হতে পারে। এমনকি ক্ষমতা হ্রাস করলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেও নির্বাচনে যেতে পারে দলটি। তবে বেগম খালেদা জিয়ার এই ভিশনে তার দল সরকারে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কী কী কার্যক্রম সম্পাদন করবে তারই বিস্তারিত ফর্দ তুলে ধরার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের এ নতুন ভিশন তৈরির জন্য স্থায়ী কমিটির ছয়জন সদস্যকে দায়িত্ব দিয়েছেন চেয়ারপারসন। এদের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্থায়ী কমিটির এই সদস্যদের সহযোগিতায় দেশের প্রখ্যাত বেশ কজন সংবিধান, উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যেই তারা এই ভিশন তৈরির কাজও প্রায় শেষ করে এনেছেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও এ নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত বছর ১৮ নভেম্বরের সংবাদ সম্মেলনেই পরবর্তীতে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে সহায়ক একটি সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করার কথা উল্লেখ করেছেন চেয়ারপারসন। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে সরকারই সবার সঙ্গে আলোচনা করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস করে নিতে পারে।

আর সংসদে সেই বিল পাস করানোর মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও তাদের আছে। তাই আমরা আশা করি সরকারের শুভবুদ্ধি হবে। তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যাতে জাতিকে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে, সে লক্ষ্যেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রয়োজন। সহায়ক সরকারের প্রস্তাবনাসহ দলের মিশন-ভিশন তৈরির কাজও চলছে। সময়মতো সবই দেখতে ও জানতে পারবেন। ’ গত জাতীয় নির্বাচনের আগে তখনকার মহাজোট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরানোর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায় বিএনপি। উপরন্তু শেখ হাসিনার প্রস্তাবের বিপরীতে ২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর একজন ‘সম্মানিত নাগরিকের’ নেতৃত্বে সাবেক ১০ উপদেষ্টাকে নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পাল্টা একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের প্রতিনিধি অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর কয়েক দফা দূতিয়ালিতেও সে সময় কোনো সমঝোতা সম্ভব হয়নি প্রধান দুই রাজনৈতিক দলে।

পরে শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের কথা বলে এরশাদের জাতীয় পার্টি ও পুরনো শরিকদের কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় এনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেন। সেই সরকারের অধীনেই দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে ও পরের আন্দোলনে সারা দেশে শতাধিক লোক প্রাণ হারায়। অবশ্য নির্বাচনে ভোটের জন্য নির্ধারিত দিনের আগেই ১৫৪ জন সংসদ সদস্যকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে তৎকালীন ইসি।

loading...