রাজনীতি নয়, দাবি আদায় করতে চায় হেফাজত

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে হেফাজতে ইসলামকে রাজনৈতিক দল হিসেবে সামনে আনতে ক্ষমতাসীন মহলে আগ্রহ থাকলেও হেফাজতের নেতারা এমন সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের সমর্থন আদায় ও জাতীয়তাবাদী ইসলামপন্থীদের ভোট বিভাজনে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অধিকসংখ্যক ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো। হেফাজতে ইসলামও এমন পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। হেফাজতে ইসলামের মাঠপর্যায়ের কোনো কোনো নেতা নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের জন্য খোঁজখবর নিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। তবে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হেফাজতের ভাবমর্যার্দা নষ্ট করতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপপ্রচার করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তারা। হেফাজত নেতারা বলছেন, রাজনীতি না করে ইমান ও আকিদা রক্ষার তাগিদে তারা আন্দোলন করছেন। সে আন্দোলন অব্যাহত আছে ও থাকবে।
দেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীরা ক্রমেই একটি শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছেন। ২০০১ সালে বিএনপি ইসলামি দলগুলোর সাথে জোট করার কারণে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। এ কারণে জোটের ভাঙন ধরাতে দীর্ঘ দিন থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরও বিএনপি জোটের ঐক্য অটুট থাকায় সরকার এখন বিকল্প হিসেবে ইসলামপন্থীদের কাছে টানার কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এর অংশ হিসেবে সরকারের মধ্যে থাকা জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে বেশ কিছু ইসলামি দল নিয়ে একটি জোট গঠন করার চেষ্টা চলছে। একইভাবে সরকার নিজেও ইসলামপন্থীদের ভোট টানার কৌশল হিসেবে হেফাজতকে রাজনীতিতে আনার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন তারা।


বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ বলেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও যাদের শাপলা চত্বরে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়েছিল, তাদের এখন কাছে টেনে নেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকলে এটি হয় না। এ কারণেই হেফাজতের দাবির ব্যাপারে এত নরম অবস্থান নিয়েছে সরকার। তিনি বলেন, শোনা যাচ্ছে হেফাজত সরকারের কাছে ২০টি আসন দাবি করেছে। এখন দেখা যাক ১৪ দলের জোটে থাকা সমাজতন্ত্রীরা কী মনোভাব দেখায়। এর পরই সরকারের অবস্থা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধরী বলেন, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো হেফাজতের সাথে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে আগে প্রতিক্রিয়া দেখালেও এখন তারা চুপ করে গেছে। সরকার তাদের কিছু একটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মূলত ক্ষমতাই এখানে আসল। হেফাজত তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে এলেও সরকার মূলত তাদের ব্যবহার করতে চাচ্ছে। আবার ক্ষমতায় আসার পর দেখা যাবে হেফাজতকে ছুড়ে ফেলা হবে।

তবে হেফাজতের নেতারা রাজনীতিতে আসার খবর নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন হেফাজতের রাজনীতিতে আসার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর বরাত দিয়ে প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহমদ বলেন, হেফাজতের আমির বারবার বলেছেন হেফাজত কখনো রাজনীতিতে জড়াবে না। ইমান-আকিদা এবং দেশাত্মবোধ ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য হেফাজত গঠিত হয়েছে। এ জন্য হেফাজতের রাজনীতিতে আসার যে খবর বলা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক।
হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, হেফাজতের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন নেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ জন্য যে খবর প্রচার করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। আমাদের অজান্তে কে বা কারা নির্বাচন কমিশনে খোঁজ নিয়েছে, তা আমরা জানি না।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, হেফাজত ইমান-আকিদাভিত্তিক, মানবতাবাদী ও দেশপ্রেমিক একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। হেফাজতের ব্যানারে রাজনীতি করার প্রশ্নই ওঠে না। হেফাজতের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন নেয়ার যে কথা প্রচার করা হচ্ছে, তা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক। তিনি বলেন, কিছু ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া সিন্ডিকেটেড সংবাদ প্রকাশ করে হেফাজত সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃতে গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম। এরপর বিভিন্ন সময়ে তারা শিক্ষানীতিসহ বিভিন্ন ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এর মধ্যে শাহবাগের আন্দোলন থেকে ইসলাম ও ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করলে তারা ২০১৩ সালের ৫ মে ইসলাম ও রাসূলকে কটূক্তিকারী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে ব্যাপক আন্দোলন ও সমাবেশ করে। এ সমাবেশে সারা দেশ থেকে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেয়। ওই দিন রাতে দাবি আদায়ে অবস্থান নিলে সরকার তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় ব্যাপকসংখ্যক হেফাজত নেতাকর্মীর মৃত্যু ঘটে বলে হেফাজত নেতারা দাবি করেন। এরপর দীর্ঘ দিন থেকে হেফাজত অনেকটা নীরব হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি শিক্ষানীতি ও শিক্ষাআইন বাতিল এবং পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কিত লেখাগুলো বাদ দেয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করে তারা। এতে সরকার সাড়া দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে বেশ কিছু পরিবর্তন করেছে। এরপর কওমি সনদ নিয়ে তারা আবারো সোচ্চার হয়। এ ছাড়া হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত মূর্তি সরানোর দাবিতে আন্দোলন করে হেফাজত। এর প্রেক্ষিতে গত ১১ এপ্রিল হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীসহ তিন শ’ আলেম গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের দাবি মেনে নিয়ে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমর্যাদার স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি সরানোর বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বাস দেন। এর পর থেকে উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বিভিন্ন সংগঠন সরকারের সমালোচনা শুরু করে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার হেফাজতকে ব্যবহার করতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ করে।

loading...