ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হাস্যকর : রিজভী

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা হাস্যকর ও ধাপ্পাবাজি।

তিনি বলেন, আমরা বলতে চাই-মিথ্যাচার করে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। এছাড়া ঢাকায় বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানান তিনি। আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব বলেন।

রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জাতির পিতার হত্যার পর নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। যারা অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, তারাই নির্বাচন প্রক্রিয়াটাকে ধ্বংস করেন। দিনের পর দিন আন্দোলন-সংগ্রাম করে গণতান্ত্রিক ধারাটা আবার ফিরিয়ে এনেছি।

আজ নির্বাচন যত সুষ্ঠু, মানুষ ভোট দিতে পারছে-এটা আমাদের অবদান। মানুষ তার পছন্দমতো লোককেই নির্বাচন করবে। আমরা সেটাই চাই। নির্বাচন প্রক্রিয়া আমরাই উন্নতি করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি।’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রুহুল কবির রিজভী বলেন, তার এহেন বক্তব্যে দেশবাসী বিস্ময়ে বাক্যহারা। জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী বর্তমান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে বলতে চাই-তাহলে বাকশাল নামক জিনিসটি কী ? আসলে তার সজ্ঞানুযায়ী গণতন্ত্র বলতে বুঝতে হবে সব দলের কর্মকান্ড বন্ধ করে দিয়ে একক কর্তৃত্বে একমাত্র দল দেশ চালাবে, ভিন্ন মত থাকবে না, গণমাধ্যম সম্পূর্ণরুপে নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নির্বাচনের অর্থ হবে ভোটকেন্দ্র ভোটারবিহীন শ্মশানভূমি, প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীবিহীন নির্বাচন।

এই সজ্ঞার সাথে একমতকারীদেরকেই প্রকৃতপক্ষে জনগণ বলে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন। সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণকারীদেরকে তিনি জনগণের অংশ বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, মানুষের ভোটাধিকার হরণকারী প্রধানমন্ত্রী ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা শুধু নিজ দেশবাসীর কাছেই নয়, বিশ্ববাসীর কাছেও এটি হাস্যকর ও ধাপ্পাবাজিমূলক বক্তব্য বলে মানুষ গণ্য করেছে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত তাদের অধীনে যত নির্বাচন হয়েছে সবগুলোই ছিল নিখূঁত সরকারী সন্ত্রাসনির্ভর।

জোর করে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জালভোট প্রদানসহ ভোটারদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শণমূলক নির্বাচনে পারদর্শী আওয়ামী লীগ। বিএনপির এই নেতা বলেন, বারবার বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে করা হয়েছে সরকারের রাবারস্ট্যাম্প। আমরা বলতে চাই-মিথ্যাচার করে জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। হাসিনা মার্কা নির্বাচনের আরেকটি জলন্ত উদাহরণ গতকালই প্রমাণিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলাধীন নবগঠিত কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাধীন কসবা উপজেলার খারেরা ইউনিয়ন এবং রংপুর জেলাধীন পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ও রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন নির্বাচনকে ঘিরে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম ও বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে ভোটারদের মধ্যে চরম ভীতির সৃষ্টি করে। সকাল থেকেই তিন জেলার নির্বাচনী এলাকাগুলোর সকল ভোটকেন্দ্র পেশীশক্তির জোরে দখলে নিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। প্রতিপক্ষের এজেন্টদের মারধর করে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়।

স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের নিকট বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উত্থাপন করলেও তারা এধরণের দুস্কর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দুরে থাক, সম্পূর্ণভাবে নিরব ও নির্বিকার থেকেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

রিজভী বলেন, আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) পাইকারিতে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ৬ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এসব প্রস্তাব ইতোমধ্যে যাচাই-বাছাই শেষ করেছে। এ নিয়ে আজ শুরু হচ্ছে গণশুনানি। শুনানি শেষে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিইআরসি তাদের সিদ্ধান্ত দেবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যে হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কার্যকর করা হলে শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়ে যাবে। মিলকারখানা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ চাকরিজীবী বেকার হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হলে এর চেইন রিএ্যাকশনে শিল্প উৎপাদন, শিল্প বহুমূখীকরণ, অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন, মানুষের গৃহস্থালীসহ ব্যবসা বাণিজ্য ও কৃষিতে ব্যাপক বিরুপ প্রভাব পড়বে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে বহুগুণ। ২০১০ সালের ১ মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে পাইকারী পর্যায়ে পাঁচবার এবং গ্রাহক পর্যায়ে সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ২০১৫ সালে সর্বশেষ গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

পুনরায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি বিএনপির পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এধরনের উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহবান জানাচ্ছি। বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে-রাজধানীর বাসিন্দাদের বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করেছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। ক্ষেত্র বিশেষে ট্যাক্স বাড়ানোর হার তিন থেকে দশ গুণ পর্যন্ত। এতে বিপাকে পড়েছেন নগরীর বাসিন্দারা। উপায় খুঁজতে সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক অফিসগুলোতে ধরনা দিচ্ছেন তারা।

loading...

একদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিতে হিমশিম খাচ্ছেন অন্যদিকে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঢাকাবাসীর ওপর হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত তাদের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজধানীবাসীর বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক। এর ফলে ঘরভাড়া বৃদ্ধিসহ মানুষের জীবনযাপনে বিরুপ প্রভাব পড়বে। সৃষ্টি হবে চরম বিশৃঙ্খলা। একই সঙ্গে আমরা রেলের ভাড়া ভাড়া ও রেশনের চাল ও গমের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। রিজভী বলেন, বর্তমান সরকার গণবিরোধী ও ভোটারবিহীন সরকার বলেই জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ওপরই করারোপ করছে। লুটপাটকে আরো তীব্র মাত্রায় অব্যাহত রাখার জন্য জনগণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত কর বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

সরকার লোকদেখানো ঢাউস বাজেট দিয়ে এখন বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটাতে জনগণের ঘাড় মটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমি রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের বাসিন্দাদের বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি, রেলের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এটি প্রত্যাহারের জোর দাবি করছি। পাশাপাশি রেশনের চাল ও গমের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এধরণের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিলের জোর দাবি করছি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় একদল আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসী মৌলভীবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরীর বাসায় হামলা চালিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছে। তিনি বর্তমানে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমুর্ষ অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এই হৃদয়বিদারক পৈশাচিক ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরীর ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী করছি।

তার আশু সুস্থতা কামনা করছি। এছাড়া শনিবার বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শাহ মোঃ মেহেদী হাসান হিমু, জাসাস সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন পশারী হিরু, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাহাবুল আলম পিপলু, সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আবু নুর ওয়ালিদ, শাহজাহানপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক খায়রুজ্জামান জিয়া, নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম, বিএনপি নেতা গুলজার আলী, মোঃ ইব্রাহিম, টি এম নাজ মাহমুদ, মঈনুল ইসলাম সুজন, যুবদল নেতা ফজলে এলাহী, ছাত্রদল নেতা মোঃ সুজন, ফরহাদ, জর্জ মিয়াকে ভুয়া ও বানোয়াট মামলায় গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বানোয়াট মামলা প্রত্যাহার ও নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবী জানাচ্ছি।

loading...