সাকার সাম্রাজ্যের ছন্দপতন কাটেনি

টানা ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন  বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। তবে যুদ্ধাপরাধের রায়ে সাকার ফাঁসি হওয়ার পর সবারই প্রশ্ন ছিলো সাকার সাম্রাজ্যের হাল ধরবেন কে? তার রাজনৈতিক গ্রুপ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে কে আসছেন? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর না মিললেও সাকার স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, নাকি ছোট ভাই ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক গিয়াসউদ্দিন কাদের (গিকা) চৌধুরী হাল ধরবেন সাকার সাম্রাজ্যের। কিন্তু গিকা চৌধুরীর অদুরদর্শিতায় নিজের পদ খুইয়ে হারিয়েছেন নিজের ক্লিন ইমেজ।জড়িয়ে পড়ছেন নানা বিরোধ ও হাঙ্গামায়। তাই স্থানীয়দের অভিমত, উত্তর জেলা বিএনপিতে সাকা পরিবারের প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

একই সঙ্গে সাকার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার দিন লাশ দাফন করতে না করতে সেদিন সকালেই ছেলে হুম্মামের সংবাদ সম্মেলন ও সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম  শহরের গুডস হিলে সাকা পরিবারের সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ‘রাজনৈতিক অভিব্যক্তির অস্তিত্ব  খুঁজেছেন অনেকেই।

একই সঙ্গে সাকা চৌধুরীর জানাজায় ছোট ভাই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী অংশ না নেওয়ায়, এমনকি দাফনের দুই দিন পর পর্যন্তও ভাইয়ের কবরে না যাওয়ায় ব্যাপক আলোচনা ছিলো রাজনৈতিক অঙ্গণে। গিকা চৌধুরী অবশ্য জামায়াত-শিবিরবেষ্টিত চট্টগ্রাম শহরের প্যারেড ময়দানে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সাকা চৌধুরীর ফাঁসির পর উত্তর জেলা বিএনপিতে মোড় নেয় অন্যদিকে। গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পরও কোন্দল মিটেনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির। এখন মুখোমুখি অবস্থানে আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী, সদস্য সচিব কাজী আবদুল্লাহ আল হাসান।

নানা ভূমিকায় বিতর্কিত গিকা চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক আসলাম চৌধুরীর বিরোধ তুঙ্গে উঠায় কার্যত দুই ভাগ হয়ে পড়েন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। পাল্টাপাল্টি সভা, হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে দলের হাইকমান্ড।কোন্দল মিটিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে গিকা চৌধুরীকে সরিয়ে আসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। আহ্বায়ক কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বিভিন্ন উপজেলা কমিটি গঠনের পর জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠানের।কিন্তু উপজেলা কমিটি গঠন শুরু হতেই নতুন নেতৃত্বের মধ্যেও বিরোধ প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী এবং সদস্য সচিব কাজী আবদুল্লাহ আল হাসান দুইজনই তৎপর নিজের অনুসারী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে উপজেলা কমিটি সাজাতে। ফলে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠিত হওয়া শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী বিভিন্ন উপজেলায় কমিটি ঘোষণার পর মীরসরাই উপজেলা এবং রাউজান, হাটহাজারী ও সন্দ্বীপ পৌরসভা শাখার নতুন কমিটি ঘোষণা করেন সদস্য সচিব কাজী আবদুল্লাহ আল হাসান।পাল্টা কমিটিতে মীরসরাই উপজেলায় আহ্বায়ক করা হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহীর কমিটির সদস্য প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরীকে। মোট ৫১ সদস্যের এ কমিটিতে অবশ্য স্থান পেয়েছেন আসলাম চৌধুরী ঘোষিত কমিটির অনেক নেতাও। এছাড়া রাউজান পৌর মেয়র ও উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী আবদুল্লাহ আল হাসানকে আহ্বায়ক করে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট রাউজান পৌর শাখা, মোহাম্মদ মাস্টারকে আহ্বায়ক করে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট হাটহাজারী পৌরসভা এবং মো. শফিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট সন্দ্বীপ পৌরসভা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে মীরসরাই উপজেলার জন্য ঘোষিত পাল্টা কমিটি মেনে নেননি আহ্বায়ক প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী।

এদিকে গত ২ মে মঞ্চ দখল নিয়ে দুই গ্রুপের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চেয়ার মারামারির মধ্য দিয়ে পন্ড হয়ে গেছে  চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি’র কর্মী সভা। চট্টগ্রাম মহানগরীর নাসিমন ভবনস্থ নগর বিএনপি’র কার্যালয়ে কেন্দ্র ঘোষিত উত্তর জেলা বিএনপি’র কর্মী সভায় প্রধান  অতিথি ছিলেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন।

এ ঘটনা উভয় পক্ষের ৮ থেকে ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। জানা যায়, পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে দুপুর থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কর্মী সমর্থকরা আসতে থাকে। বিশাল মঞ্চ এবং প্যান্ডেল এবং  নাসিমন ভবনের আশপাশ এলাকা পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

কিন্তু দুপুর দুইটার দিকে হঠাৎ করে সীতাকুন্ডের আসলাম গ্রুপের কর্মীরা শ্লোগান দিয়ে মঞ্চ দখলে নেয়। এসময় তারা উত্তর বিএনপি’র (কারান্তরীণ) আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরীর নামে স্লোগান দিতে থাকে।

উত্তর জেলা বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গিয়াস কাদের চৌধুরীর সমর্থকরা তাদেরকে বাধা দিলে এবং মঞ্চ থেকে সরাতে গেলেই দেখা দেয় বিপত্তি। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে চেয়ার মারামারি, ধাক্কাধাক্কি, ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় কর্মী সভার কার্যক্রম।

এর কিছুক্ষণ পর বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, সহ সভাপতি মীর মো. নাসির উদ্দিন, সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, সহ-সভাপতি গোলাম আকবর খন্দকারসহ অন্যান্য নেতারা এসে উভয় পক্ষকে কিছুটা শান্ত  করেন। বিশৃংখল পরিবেশের মধ্যে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন একটি হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে কর্মী সভা সমাপ্ত করে চলে যান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গিকা চৌধুরী মুঠোফোনে জানান, মনে রাখতে হবে আমি সাকা চৌধুরীর ভাই গিকা চৌধুরী। সাকা চৌধুরী যে দাপটে তার সাম্রাজ্যের হাল ধরে রেখে গেছেন তার হাল আমিই ধরব। উত্তর জেলা বিএনপির নেতৃত্বে আমার অবস্থান আমি পুনরায় ফিরিয়ে আনব। তাই আজ যে ছন্দপতন, তা আর বেশিদিন থাকবে না বলে জানান তিনি।

loading...
loading...