ভারতের সাথে সামরিক চুক্তির আগাম ফলাফলঃ ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না

ভারত কর্তৃক ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা লাইন অব ক্রেডিট প্রদানের লক্ষ্যে বাংলদেশ ও ভারতের মাঝে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও জনমনে শঙ্কার প্রেক্ষিত বিশ্লেষন।

ভারত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রতিরক্ষা লাইন অব ক্রেডিট প্রদান করবে – এমন খবরে জনমনে ব্যাপক শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। শঙ্কার কারন এই যে, উক্ত ঋনের টাকা দিয়ে যদি ভারতের নিম্নমানের সমরাস্ত্র আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য কেনা হয় তাহলে তো দেশের সর্বনাশ হবে।
পাঠক বন্ধুগন মূল প্রসংগে যাবার পূর্বে বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত দুটি বিষয়ে প্রশ্ন রেখে তার সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রদানের মাধ্যমে আলোচনা শুরু করতে চাই।

প্রশ্ন এক, সশস্ত্র বাহিনীকে মৌলিক প্রশিক্ষন প্রদানের ক্ষেএে মূল বিবেচ্য বিষয় কি? এ প্রশ্নের উত্তরে বলবো যে, একটি দেশের বাস্তব নিরাপত্তা ঝুকি (perceived threat) সঠিক ভাবে নিরুপন করার পর তা সফলভাবে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে রণকৌশল নির্ধারন করা সাপেক্ষে উক্ত রনকৌশলের উপর সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে মৌলিক প্রশিক্ষন প্রদান করা।

প্রশ্ন দুই, কোন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব প্রদান করা হয়? এ প্রশ্নের উত্তরে অবশ্যই বলবো যে, কোন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই বিবেচনায় নেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট দেশের সম্ভাব্য/বাস্তব প্রতিপক্ষ কি ধরনের সমরাস্ত্র ব্যবহার করছে এবং উক্ত সমরাস্ত্রকে সফল ভাবে নিষ্ক্রিয় করার জন্য তার কি ধরনের সমরাস্ত্রের প্রয়োজন। এসব বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষন করেই একটি দেশ কোন একটি সমরাস্ত্র ক্রয়ের ব্যাপারে সিদ্ধ্যান্ত গ্রহন করে থাকে।

এবার মূল আলোচনা শুরু করছি। শুরুতেই বলতে চাই যে, সবার ধারনা ভারত ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রতিরক্ষা লাইন অব ক্রিডিট প্রদান করবে সে দেশ থেকে সমরাস্ত্র আমদানীর জন্য– অন্য কোন দেশ থেকে নয়। আর সে কারনেই জনমনে ব্যাপক শঙ্কার উদ্রেক হয়েছে। প্রকৃত অর্থেই জনগনের ধারনা ও শঙ্কা অমূলক নয়। এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক।

এ পর্যায়ে ভারতের সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরজ্ঞাম রপ্তানির সংক্ষিপ ইতিহাসের প্রতি একটু দৃষ্টি দেয়া যাক। ভারত এ যাবত নেপাল ও ওমানে ভারতের তৈরী ৫.৫৬ মিলি মিটার ক্যালিবারের INSAS (Indian Small Arms System) রাইফেল ও এলএমজি রপ্তানী করেছে। প্রথম দফা আমদানীর পর উক্ত অস্ত্রসমূহ নিম্ন মানের প্রমানিত হওয়ায় উভয় দেশ পুনঃ আমদানী থেকে বিরত রয়েছে। তাছাড়া, নেপাল ভারত থেকে হিন্দুস্থান এ্যারোনোটিকস লিঃ (HAL) নির্মিত দ্রুভ (Druv) হেলিকপ্টার আমদানী করেছে। সবশেষ ০২ আগষ্ট ২০১৩ তারিখে মৌরিতাস তাদের ন্যাশনাল কোষ্ট গার্ডের জন্য ভারত থেকে কলকাতাস্থ গার্ডেন রীচ শিপ বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিঃ নির্মিত ‘অফ শোর প্যাট্রল ভেসেল’ আমদানী করেছে।

ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম সম্পর্কে সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মূল্যায়নের প্রতি একটু দৃষ্টি দেওয়া প্রাসংগিক মনে করছি। INSAS এ্যাসল্ট রাইফেল ও এলএমজি ভারতীয় সেনা বাহিনীকে বরাদ্দ করা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। প্রায় দুই দশক ব্যবহার করার পর চলতি বৎসরের মার্চ মাসে ভারতীয় সেনা বাহিনী উক্ত এ্যাসল্ট রাইফেল অবসরে পাঠানোর ঘোষনা দিয়েছে। বলা বাহূল্য যে, উক্ত এ্যাসল্ট রাইফেল ভারতের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (CRPF)-কে বরাদ্দ করা হয়েছিল। তারা অনেক আগেই তা প্রত্যাখান করেছে।

ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির অর্জুন ট্যাংককে মেইন ব্যাটল ট্যাংক (MBT) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষনা দিয়েও ভারতীয় সেনা বাহিনী সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কারন, একটি মাত্র রেজিমেন্টকে ঐ ট্যাংক বরাদ্দ করা হয়েছিল। উক্ত রেজিমেন্ট কর্তক ‘ইউসার টেষ্ট ট্রাইল’-এ অর্জুন ট্যাংক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। সে কারনে ভারতীয় সেনা বাহিনী আর কোন রেজিমেন্টকে ঐ ট্যাংক বরাদ্দ না করার সিদ্ধ্যান্ত নিয়েছে।

ভারতীয় বিমান বাহনীর জন্য নির্মিত বহুল আলোচিত ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির ‘তেজাজ’ যুদ্ধ বিমান – বিমান বাহিনীকে রীতিমত হতাশ করেছে। তারা এক স্কোয়াড্রন (২০টি) যুদ্ধ বিমান নিয়ে বিপদে আছে। আর কোন যুদ্ধ বিমান নিবে না বলে কর্তৃপক্ষকে তারা জানিয়ে দিয়েছে। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, ‘তেজাজ’-এ রাশিয়ার তৈরী ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রসংগত উল্লেখ্য যে, রাশিয়ার তৈরী Su-30 অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমানের বেশ কিছু সংখ্যক প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির আওতায় ভারতের হিন্দুস্থান এ্যারোনোটিকস লিঃ Su-30 MKI (Mark India) নামে লাইসেন্স নিয়ে তৈরী করছে। সম্প্রতি তারা ১৮টি নিম্ন মানের Su-30 MKI ভারতীয় বিমান বাহিনীকে হস্তান্তর করে। উক্ত বিমান সমূহে পুরাতন ইঞ্জিন সংজোজন করা হয়েছে বলে জানা যায়। ভারতীয় বিমান বাহিনী এ ব্যাপারে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

যা হোক, আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর নীতি নির্ধারকগণ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন এ আস্থা এবং বিশ্বাস আমার রয়েছে ও থাকবে। ধৈর্য সহকারে যারা আমার নিবন্ধ টি পাঠ করবেন তাদের সকলকে আগাম ধন্যবাদ।

loading...