‘এখনো মেয়েরা নিজের রক্ত দিয়ে আমাকে প্রেমপত্র লেখে’

‘এখনো মেয়েরা নিজের রক্ত দিয়ে আমাকে প্রেমপত্র লেখে। কেউ কেউ আমাকে বিয়ে করতেও পাগল। ’ এমনটাই বলছিলেন বাংলাদেশের বর্ষীয়ান ও জনপ্রিয় লেখক কাসেম বিন আবু বকর।

বাংলাদেশী প্রবীণ ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবু বকর। তার উপন্যাসগুলো হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়ে থাকে। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকেও তাকে নিয়ে জোরালো বিতর্ক আছে। অনেকের দাবি, কাসেম বিন আবুবাকার বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। এখন পর্যন্ত তার লেখা প্রেমের কাহিনিগুলো গ্রাম-বাংলার তরুণ তরুণীদের মধ্যে এমনকি অল্পবয়সী রক্ষণশীল পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচিত হয়ে থাকে।

তবে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে বরাবরই আলোচনার বাইরে ছিলেন কাসেম বিন আবুবাকার। ঔপন্যাসিক হিসেবেও সাহিত্য সমাজে ‘স্বীকৃতি ও সমাদর’ পাননি তিনি।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্যা স্টার ও মালয়মেইল, পাকিস্তানের দ্য ডন, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল, হাঙ্গেরির হাঙ্গেরি টুডেসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ফলাও করে কাসেমকে নিয়ে ওই প্রতিবেদন ছেপেছে।

তার লেখা এখন এক ধরনের রেঁনেসা বা পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে মধ্যপন্থী ইসলাম থেকে বাংলাদেশিরা এখন ধর্মকে আরও রক্ষণশীলভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বার্তা সংস্থা এএফপি’কে আবু বকর স্মৃতিচারণ করেন, অনেক মেয়েরা রক্ত দিয়ে আমাকে চিঠি লিখে তাদের ভালোবাসার কথা জানায়। এমনকি বিয়ে করার মত পাগলামীও প্রকাশ করেছে।

তিন দশকের বেশি আগে লিখিত হয় আবু বকরের প্রথম উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’। এটি মূলত ইসলামিক মূল্যবোধ প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত এক অনবদ্য রোমান্স কাহিনি। এই উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা দুটি ভিন্নধর্মী ইসলামী মূল্যবোধ লালিত পরিবারের সদস্য হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মিল হয় এবং বিয়েও হয়। এবং সেখানে রোমান্স ও সম্পর্কের পরিসীমা দেখানো হয়েছে তাতে ইসলামী বিধি-নিষেধ মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আছে লেখকের।

১৯৭০ সালে প্রথম উপন্যাস লেখা শুরু করেন এই লেখক। তিনি ছিলেন একজন বইয়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী। যখন তিনি বই বিক্রি করতেন, তিনি দেখতে পেতেন বেশিরভাগ প্রেমের উপন্যাসের পটভূমি আধুনিক ঘরানার উচ্চবিত্ত শহুরে সমাজকে কেন্দ্র করে লেখা। তখন তিনি গ্রামীণ পটভূমিতে প্রেমের উপন্যাস লেখার তাগিদ অনুভব করেন। তার মতে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে একটি বিশাল সংখ্যক মানুষের বাস গ্রামে। যারা রক্ষণশীল ধার্মিক চেতনার মানুষ। তাদেরকে শহুরে প্রেমের উপন্যাস থেকে বঞ্চিত রেখেছেন সেকালের লেখকেরা। আর তাই তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে শহর আর গ্রামের মধ্যকার এই পার্থক্য দূর করার তাড়না থেকেই উপন্যাসিক হিসেবে আবির্ভূত হন।

তবে সেসময় তিনি অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। তাকে বলা হয়, ‘মোল্লাদের উপন্যাস বিক্রি হয় না। ’ তবে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক কাদেরুদ্দিন শিশিরের মতে, কাসেম বিন আবু বকর তার উপন্যাস দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে মোহিত করতে পেরেছেন, যা এর আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেন নি। এছাড়াও বলা হয়ে থাকে, কাসেম বিন আবুবাকারের উপন্যাস প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য সেরা উপহার। যুবক প্রেমিক সমাজ এই বইগুলো তাদের প্রেমিকা ও বাগদত্তাদের উপহার দেয়া শুরু করেন।

‘ফুটন্ত গোলাপ’ উপন্যাসে লেখক মুসলিম পরিবারের দু’জন প্রেমিক যুগলের কথা লিখেছেন, যারা বিয়ের জন্য পারিবারিক সম্মতি চায়। এই প্রেক্ষাপটের উপন্যাসটি তিনি ১৯৭৮ সালে লিখেন। তবে বইটি প্রকাশিত হতে সময় নেয় প্রায় এক দশক। এই প্রসঙ্গে কাসেম জানান, প্রকাশকেরা বলেন, মোল্লাদের বই বিক্রি হয় না। আর তাই তিনি তার বইয়ের স্বত্ব মাত্র ১০০০ টাকায় প্রকাশকের কাছে বিক্রি করে দেন। কিন্তু বইটি প্রকাশের পর বদলে যায় পুরো চিত্রটি। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যান এই লেখক। এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটার পর প্রায় এক ডজনের মত উপন্যাস লেখেন কাসেম বিন আবুবাকার।

আরেক উপন্যাসিক মাজহারুল পারভেজ জানান, তার বইয়ের জনপ্রিয়তার কারণে অসংখ্য ছাত্র মাদ্রাসায় দাখিল হয়। তিনি বলেন, ‘গ্রামের মানুষ এই লেখকের লেখায় নিজেদের গল্প খুঁজে পেতেন। তার লেখার ভাষা তাদের তৃপ্তি দিতে সক্ষম হয়। ’

ওদিকে অবসরের দুই বছর পরেও কাসেম বিন আবুবাকারের ভক্তরা তাকে ব্যস্ত রেখেছেন। এখনও এই অশীতিপর লেখক তার ভক্তদের জন্য বইয়ের পাতায় অটোগ্রাফ দেন। অসংখ্য নারী ভক্ত বোরকায় মুখ ঢেকে দাঁড়ায় তার অটোগ্রাফের জন্য। শুধু তাই নয়, এখনও ভক্তদের পাঠানো প্রচুর চিঠি পান এই লেখক। বিয়ের প্রস্তাব থেকে শুরু করে অসংখ্য ধন্যবাদ সংবলিত চিঠিও পান কাসেম বিন আবুবাকার। অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ ইসলামের সৎ পথে এসেছেন তার লেখনীর কারণে। সেজন্য তাকে তার লেখার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে চিঠি পাঠান ভক্তরা। এই প্রসঙ্গে কাসেম মজার ছলে জানান, ‘ডাকপিয়ন আমাদের বাড়িতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি চিঠি নিয়ে আসতেন। এমন চলতে থাকায় একসময় তিনি আমার পরিবারের সদস্যে পরিণত হন!’

loading...
loading...