বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান

বাংলাদেশ একটি অপার সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। আয়তনের দিক দিয়ে ছোট হলেও এদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি। আর এই বিপুল জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী। বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী। যা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার সমান। আর এ শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চমাধ্যমিক পড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ভর্তি হন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। আর এ বিতর্কের সত্যতা পাওয়া যায় সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেটিং পয়েন্টে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকায়। এমনকি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও নেই। অথচ আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, এমনকি উন্নতিতে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও রয়েছে।

কিন্তু কেন? বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা এই পিছিয়ে পড়ার কারণ বিশ্লেষণ করে তা উত্তরণের পথ বের করবেন কী? আমাদের দৃষ্টিতে তার কিছু কারণ উল্লেখ করছি। আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক শিক্ষকতাকে টাকা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন, গবেষণা হিসেবে নয়।  এছাড়াও রয়েছে দলবাজি করে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে অনেক অযোগ্য শিক্ষকের নিয়োগ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছু শিক্ষক রয়েছেন যারা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতার রাখেন না অথচ দলবাজী করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে বসে আছেন। এছাড়াও রয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা। তারা ক্লাস নেওয়ার চেয়ে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে সেশন জট, উচ্চশিক্ষার মানের পিছনে অনেক বড় অন্তরায়।

শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতার একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের নামকরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আমরা অনেকেই জানি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক টিউটোরিয়াল পরীক্ষার সময়সূচি দিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীরা যথাসময়ে পরীক্ষার হলে হাজির। কিন্তু শিক্ষকের খোঁজ নেই। শিক্ষার্থীরা ১ ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করার পর ওই শিক্ষকের কাছে ফোন করেন। অপরপ্রান্ত থেকে শিক্ষক বললেন, ‘আজ আমার বাচ্চার স্কুলে পরীক্ষা আছে, তোমাদের পরীক্ষা নিতে পারবো না।’

দেখুন, ‘বাচ্চার স্কুলে’ পরীক্ষার জন্য টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ করে দিলেন। এছাড়া আছে শিক্ষার্থীদের গদবাঁধা বড় ভাইদের ট্রাডিশনাল নোট ফটোকপি করে পড়া। ২০ বছর পূর্বে কোনো এক বড় ভাই নোট করেছেন, যার লেখা এখন অনেকাংশই বোঝা যায় না। সে সব নোট বা সিট পড়ে কোনো রকমে পরীক্ষার বৈতরণী পার করেন শিক্ষার্থীরা।

এছাড়াও ছাত্র রাজনীতির নামে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের লাগামহীন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি ও পরস্পরে হানাহানিতে হরদম লিপ্ত হতে দেখা যায়। যার ফলে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাসের পর মাস বন্ধ থাকে। সাধারণ ছাত্রদের সেশনজটসহ বিভিন্ন ভোগান্তিতে পড়তে হয় এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদালয়গুলো বিদ্যুত্ গতিতে পিছিয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে কবুতরের খোপের মতো রুম ভাড়া করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষা বাণিজ্য ও সার্টিফিকেট বাণিজ্য চরম আকারে চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষার নামে এ বাণিজ্য দেশের উচ্চশিক্ষার মানকে দিন দিন আরো নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘দেশ ভালো হয়, যদি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো হয়।’ তাই দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউজিসি ও মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নিকট দেশের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আবেদন করছি।

loading...