চাল নিয়ে মন্ত্রী-ব্যবসায়ী বিতর্ক

সরকারের কাছ থেকে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস পেয়ে চালের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা কমতে পারে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন। তবে এ জন্য তারা সরকারের কাছে চাল আমদানি ও পরিবহনে পাটের বস্তার বদলে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন। সেই সঙ্গে স্থলবন্দর দিয়ে চালবাহী ট্রাকগুলো যাতে দ্রুত আসতে পারে, সে ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। সরকারের তরফ থেকে দাবিগুলো মেনে নেয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে সরকারের তরফ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও বর্তমান অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবিদ হাসান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দেশের চালকল মালিকদের সংগঠনগুলোর নেতারা ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসা করেন-এমন কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী, সরকার সমর্থিত গ্রুপের সভাপতি খোরশেদ আলম খান, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানসহ বিভিন্ন চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নেতারা।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিশেনের সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়েছে। বুধবার থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই চালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা কমে যাবে।

বৈঠকের শুরুতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দেশে চালের কোনো সংকট নেই এবং সারা দেশে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে- এমন মন্তব্য করে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ তোলেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে উল্টো সরকারি নীতির সমস্যা ও সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণেই সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী দেশে এক কোটি টন চাল মজুত আছে জানিয়ে অভিযোগ করেন, ব্যবসায়ীরা মোটা চাল মেশিন দিয়ে কেটে মিনিকেট বানান। ব্যবসায়ীরা তার এ বক্তব্যেরও প্রতিবাদ করেন। এসময় চালকল মালিক চিত্ত মজুমদার বলেন, আপনার মতো একজন সিনিয়র মন্ত্রীর কাছে আমরা এ ধরনের মন্তব্য আশা করি না। কোথায় এক কোটি টন চাল মজুত আছে, আমাদের দেখান। সরকার ভারত থেকে বেশি দামে চাল আমদানি করছে। কিন্তু আমাদের যদি দায়িত্ব দিত, তাহলে আমরা সরকারের চেয়ে কম দামে ভারত থেকে চাল এনে দিতে পারতাম।

এরপর ব্যবসায়ীরা একে একে চালের দাম বাড়ার কারণগুলো তুলে ধরেন। দিনাজপুরের জহুর অটো রাইস মিলের মালিক আবদুল হান্নান নিজেকে সরকারদলীয় সমর্থক পরিচয় দিয়ে বলেন, চালের আমদানি শুল্ক কমাতে গিয়ে অনেক সময় নেয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে কমানো হয়েছে। এসব কারণে দাম বেড়েছে।

সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমি যখন খাদ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন ভারত থেকে চাল আমদানি করতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মাত্র পাঁচ লাখ টন চাল আনার চুক্তি করেও কোনো চাল আনতে পারিনি। পরে ভিয়েতনাম থেকে চাল এনে সংকট মোকাবিলা করেছি।

দেশের উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ওএমএস
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ব্যবসায়ীদের চালের দাম কমানোর অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সরকার নিজেও আমদানি করে মজুত বাড়াচ্ছে। বুধবার থেকে ৫০ লাখ মানুষকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়ার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি স্থগিত করেছি। একই সাথে আজ থেকে সারা দেশের উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ওএমএস (খোলা বাজারে চাল বিক্রি) কর্মসূচি চালু করছি।

তিন মন্ত্রীর সামনেই চাল ব্যবসায়ীদের কথা কাটাকাটি
মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক চলাকালে কথা কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন চাল ব্যবসায়ীরা। বৈঠকের এক পর্যায়ে বক্তব্য দেয়াকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভা চলাকালে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেন চাল ব্যবসায়ীরা। এক পর্যায়ে বক্তব্য দিতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সরকার সমর্থিত পক্ষের সভাপতি খোরশেদ আলম। এসময় অপর পক্ষের নেতা আব্দুর রশিদ ও লায়েক আলী খোরশেদ আলমকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, তিনি সরকারের দালাল। তিনি সরকারকে বিভ্রান্ত করছেন। এ পর্যন্ত এক ছটাক চাল সংগ্রহ করতে তিনি সরকারকে সাহায্য করেননি। ফলে তার এখানে সরকারকে সহযোগিতা করার কোনো সুযোগ নেই।

আব্দুর রশিদ ও লায়েক আলীর সমর্থক ব্যবসায়ীরা খোরশেদ আলমের উদ্দেশে বলেন, দালালি ছাড়েন, সরকারের গুদামে চাল দেন। এটিই হবে সরকারের বড় সহযোগিতা। পরে খোরশেদ আলম আর বক্তব্য দিতে পারেননি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে অটো, মেজর ও হাস্কিং রাইস মিল আছে ২০ হাজার। এর মধ্যে মাত্র ৪০০ অটো রাইস মিল মালিকদের নেতা সরকার সমর্থিত খোরশেদ আলম। বাকি ১৯ হাজার ৬০০ মিল মালিকদের নেতা আব্দুর রশিদ ও লায়েক আলী।
বৈঠকের এক পর্যায়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশটা আমাদের। আমরা আপনাদের, আপনারা আমাদের। আসুন আমরা হাতে হাত মিলিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

চালে প্লাস্টিক বস্তা ব্যবহার করা যাবে : বাণিজ্যমন্ত্রী
চাল আমদানি, উৎপাদন ও সরবারহে আগামী তিন মাস চটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যে যেভাবে আনতে পারেন চাল আনবেন, কেউ বাধা দেবে না। প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার দুই তিন মাসের জন্য রিল্যাক্স করে দিয়েছি। সংকট মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের যেকোনো উপায়ে চাল আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

বৈঠকের শুরুতে চাল ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে চটের বস্তা ব্যবহারে সরকারি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি তুলে ধরেন। ব্যবসায়ীরা বলেন, চটের বস্তায় চাল আমদানি করলে প্রতি কেজিতে এক টাকা খরচ বাড়ে। আর প্লাস্টিকের বস্তায় খরচ হয় মাত্র ১৫ পয়সা। ব্যবসায়ীদের এ অভিযোগ শুনে বাণিজ্যমন্ত্রী আজ থেকে চটের বস্তায় চাল আমদানির সরকারি বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত স্থগিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সংকট না কাটা পর্যন্ত যেকোনো উপায়ে ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির নির্দেশনা দেন। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে চালের দাম কমার জন্য ইতিবাচক বলে উল্লেখ করে সিটি গ্র“পের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, এর ফলে প্রতি কেজিতে চালের দাম ১/২ টাকা কমবে।

চালের দাম কমাতে প্লাস্টিকের বস্তা
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশিদ জানান, কিছু কুচক্রী মহলের ইন্ধনে চালের আড়তে অভিযান চালানো হচ্ছে। এতে সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাজারে চালের ঊর্ধ্বমুখী দাম কমাতে পাটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহারসহ তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেগুলো হলো চালের সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত বাধ্যতামূলক পাটের বস্তা ব্যবহার শিথিল করে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহার করা যাবে, আজ থেকে চালের মিলে অভিযান বন্ধ করা হবে এবং চাল আমদানি ও পণ্য খালাসে সব জটিলতা দূর করা হবে। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হলে আজ বুধবার থেকে মোটা চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা কমবে।

loading...

উল্লেখ্য, দুই দফা বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি চালের মজুদ তলানিতে নেমে আসার প্রেক্ষাপটে সরকার গত অর্থবছরের শেষ দিকে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়। সেই সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি উৎসাহিত করতে ২৬ শতাংশ থেকে শুল্ক নামিয়ে আনা হয় দুই শতাংশে।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায় মিলিয়ে গত আড়াই মাসে রেকর্ড পরিমাণ চাল আমদানি হলেও বাজারে চালের দাম বাড়ছে, যার পেছনে মিল মালিকদের কারসাজিকে দায়ী করে আসছে সরকার। সরকারি হিসেবেই মোটা চালের দাম গত এক মাসে বেড়েছে ১৮ শতাংশ, এক বছরে বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এখন বাজারে ৫০ টাকার নিচে কোনো মোটা চাল নেই।
ধারাবাহিকভাবে চালের দাম বৃদ্ধির মধ্যে মজুদদারি বন্ধে প্রশাসন গত সপ্তাহে বিভিন্ন রাইস মিলে অভিযান শুরু করে। কুষ্টিয়ার খাজানগরে বাংলাদেশ চালকল মলিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদের চালকলে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হয়। কিন্তু রশিদকে জরিমানা করার পর এই কদিনে মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) চার শ’ টাকার মতো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অন্যান্য চালের দাম।

চালকলগুলোতে অভিযান চালাতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়ার প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, এখন যেহেতু আপনাদের সাথে বৈঠক হল, তাই আমি সংশ্লিষ্টদের বলছি, এখন যাতে কোনো ব্যবসায়ী আর হয়রানির শিকার না হয়। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে চাল পরিবহনে বিভিন্ন সমস্যা দূর করতেও সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তার এই বক্তব্যের পর সভাকক্ষে উপস্থিত বেশ কয়েকজন চাল ব্যবসায়ী বলেন, দুই এক দিনের মধ্যেই চালের দাম কমতে শুরু করবে।

বৈঠকের পর বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিশেনের সভাপতি আব্দুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ভালো একটি বৈঠক হয়েছে। সরকারের সাথে আমাদের কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্ট হয়েছিল। বৈঠকে বসে সে সব বিষয়ের সুরাহা হয়েছে। আমরা সবাই মিলে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। আশা করি, আগামী দু’এক দিনের মধ্যেই চালের দাম কমতে শুরু করবে।

loading...