নির্বাচন, নিরাপত্তা ও সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে-৪

নির্বাচন, নিরাপত্তা ও সেনাবাহিনী ইত্যাদি বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে চারটি বা তিনটি কলাম ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে (১২ জুলাই, ১৯ জুলাই, ২৬ জুলাই ও ২ আগস্ট)। গত সপ্তাহের তথা ২ আগস্টের কলামে শেষ অনুচ্ছেদের প্রতি সম্মানিত পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। ওই অনুচ্ছেদটি আজকের কলামে পুনরায় লিখলাম, অর্থাৎ হুবহু নিচের অনুচ্ছেদটি।

কিছু সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে নিতে হবে, এখন নয়
আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন ১৭ বা ১৮ মাস পরে হবে বলেই আমরা ধরে নিচ্ছি। সেই সময় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী রকম হয়, পুলিশবাহিনীর আইজি কে হন, র‌্যাব বাহিনীর মহাপরিচালক কে হন, গুম-খুন ইত্যাদির ফ্রিকোয়েন্সি বা হার কী রকম থাকে, যে চার-পাঁচটি সিটি করপোরেশনে আগামী বছরের শুরুতেই নির্বাচন হবে, সেগুলোর পরিচালনা ও ফলাফল কেমন হয়- ইত্যাদি সব কিছুর ওপরেই নির্ভর করবে সেনা মোতায়েনের ব্যাপ্তি ও নিবিড়তা। ইতোমধ্যে পত্রিকায় লিখেই চলেছি, অদূর বা দূর ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা না করে আমার কথাগুলো আমি বলে যাচ্ছি।

যেসব সম্মানিত পাঠক, যেসব আগ্রহী পাঠক, যেসব পরিশ্রমী তরুণ কথাগুলোকে সংরক্ষণ করবেন, তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা থাকলেও চূড়ান্ত উপকারিতা পাবেন সংরক্ষণকারী নিজে। কারণ সব সময় সব কথা বের হয় না। ব্যাখ্যা দেবো না; শুধু মন্তব্যটিই করলাম : ‘বর্ষাকালে তুফান ছাড়া বৃষ্টি পাওয়া যায়, কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বর অথবা মার্চ-এপ্রিল মাসে বৃষ্টি আসে সিডর, আইলা, নার্গিস, মোরা ইত্যাদি নামের তুফানের সাথে।’ আমি নিবেদন করে রাখছি যে, ২০০০ সালের সরকারি দল (আওয়ামী লীগ) এ কথা বাজারে ছেড়ে দিয়েছিল, নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন নেই। সেই ২০০০ সালে বা ২০০১ সালে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল; অনেক লেখালেখি হয়েছিল। ফলে ২০০১ সালের আগস্ট মাসে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তারা সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকালে, নির্বাচন কমিশনের আদেশ মোতাবেক দেশের খেদমত করা। ওই ২০০০ বা ২০০১ সালের আলোচনার সারমর্ম ইনশাআল্লাহ তুলে আনব, স্মৃতিচারণের পাশাপাশি।

স্মৃতিচারণ : ইতিহাসের গুরুত্ব
স্মৃতিচারণ করার কথা গত সপ্তাহে বলে রেখেছি। কিঞ্চিত ভিন্ন ভাষায় বা ভিন্ন শব্দমালায় কথাগুলো আগেও বলেছি, আজ আবার বলছি। বলার কারণ হলো, ২০১৭ সালের পাঠকের নিকট, ২০১৭ সালের সচেতন নাগরিকের নিকট একটি বিষয় তুলে ধরা। বিষয়টি হলো, একটি জাতির জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিলগ্ন আসে। ওই ক্রান্তিলগ্নগুলোতে জাতির চিন্তাশীল শক্তিকে এবং দেশপ্রেমিক নেতৃত্বকে সময়ের তাগাদায়, ক্ষুদ্র চিন্তা পরিহার করে, দলীয় স্বার্থ পরিহার করে, গৎবাঁধা বা প্রথাগত চিন্তা পরিহার করে ব্যতিক্রমী কিছু চিন্তা করতে হয়, ব্যতিক্রমী কিছু আবিষ্কার করতে হয়, ব্যতিক্রমী কিছু অনুসরণ করতে হয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ৭ তারিখ দুপুরের পরে, তৎকালীন রমনা রেসকোর্সের বিশাল জনসভার মঞ্চে উঠে এবং মঞ্চে বসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও চিন্তা করতে হয়েছিলÑ কী বলব, কী বাক্য দিয়ে কী বোঝাব, কী কর্মপন্থার ইশারা দেবো? তিনি শুধু আওয়ামী লীগের কথা চিন্তা করেননি, তিনি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানবাসী তথা বাঙালি জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেছিলেন। তিনি মানুষের প্রাণ রক্ষার কথা চিন্তা করেছিলেন, তিনি শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কথা চিন্তা করেছিলেন, যুগপৎ শাসকগোষ্ঠীকে কিছু বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। সে জন্যই ৭ মার্চের ভাষণ কালোত্তীর্ণ, ঐতিহাসিক। অনুরূপ একটি ক্রান্তিকাল এসেছিল ১৯৯০ সালের শেষাংশে। অনুরূপ একটি ক্রান্তিকাল বাংলাদেশীদের সামনে আজ আবার উপস্থিত। গণতন্ত্র প্রায় বিলুপ্ত, একদলীয় শাসন প্রায় সমাগত, জনগণের ক্ষমতা প্রায় লুণ্ঠিত, জননিরাপত্তা প্রায় অনুপস্থিত। এরূপ অবস্থায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে, বাস্তবসম্মত গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাংলাদেশকে পুনঃস্থাপন করতে ২০১৮ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচন অতি গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ইতিহাসে রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্ন মোকাবেলা করেছে। সেসব দেশ কিভাবে করেছে, সেটি জানলে অন্য দেশ শিক্ষা নিতে পারে। যা হোক, আমরা অন্য দেশের অভিজ্ঞতার জন্য অপেক্ষা করছি না। আমরা আমাদের ইতিহাস ঘাঁটতে চাই। আমাদের ইতিহাসে ক্রান্তিলগ্ন মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো হুবহু অনুসরণ করা হবে এমন কল্পনা করা ঠিক নয়। অতীতের অভিজ্ঞতাগুলোকে হুবহু অনুসরণ করার জন্য আমিও কোনো আহ্বান জানাব না। আহ্বান জানাব অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে, বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে রেখে, গৎবাঁধা প্রক্রিয়া পরিহার করে, জনগণ ও রাজনৈতিক পরিবারকে সাথে নিয়ে কী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া যায় সেটি চিন্তা করতে। ১৯৯০-৯১এর কথায় ফিরে যাই।

স্মৃতিচারণ : জাতির খেদমতে সেনাবাহিনী
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করার পর একটি বিশেষ ধরনের নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশ শাসন করেছিল। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে যাদের বয়স ৩৫ বা ৪০ বছরের কম, তারা ১৯৯০ সালের নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার সাথে পরিচিত নন। তাই অতি ক্ষুদ্র পরিসরে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারটির প্রেক্ষাপট, পরিচয় ও দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে কিছু কথা এখানে তুলে ধরছি।

ওই সময় বাংলাদেশের সংবিধানে নিরপেক্ষ সরকার প্রসঙ্গে কোনো বিধান ছিল না, কিন্তু জাতীয় রাজনৈতিক প্রয়োজনে, তৎকালীন তিনটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের এবং জোটবহির্ভূত রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি ও সমঝোতার মাধ্যমে ওই অভিনব সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনটি রাজনৈতিক জোটের একটি ছিল আওয়ামী লীগ-কেন্দ্রিক, একটি ছিল বিএনপি-কেন্দ্রিক এবং একটি ছিল বাম দলগুলো সম্মিলিত। তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে যুগপৎ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সোচ্চার ও সক্রিয় ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টি অসুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ইতিহাসের স্বচ্ছতার স্বার্থে উল্লেখ করে রাখতে চাই, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ, প্রেসিডেন্ট বা অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট তথা একটি নিরপেক্ষ সরকারের বা ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের প্রধান হওয়ার জন্য নিজের থেকে আগ্রহ প্রকাশ করেননি; রাজনীতিবিদদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি সম্মত হয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেছিলেন; উপদেষ্টাদের সবাই অরাজনৈতিক স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন।

রাজনৈতিক জোট ও দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির প্রতি কী দাবি ছিল? দাবিটি কোনো বিদেশী আইনবিদ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিখে দেননি। আমাদের রাজনীতিবিদেরাই মানুষের মনের কথাগুলোকে গুছিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন। দাবিটি ছিল : সাহাবুদ্দীন সাহেব যেন একটি সুন্দর, সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠান করিয়ে দেন। এই দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে সাহাবুদ্দীন সাহেব কী করলেন? তিনি নির্বাচন কমিশনের আগ্রহ ও নিষ্ঠা, বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার ওপর ভরসা করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের পৃষ্ঠপোষকতায়, সর্বমহলের সহযোগিতায়, তৎকালীন নির্বাচন কমিশন ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে পার্লামেন্ট নির্বাচন করায়; যেটি সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।

আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ব্যাখ্যা করি। জুন ১৯৯০-এর শেষ সপ্তাহ থেকে আমি সেনাবাহিনীর সদর দফতরে ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স নিযুক্ত হয়েছিলাম। ১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে হঠাৎ করেই এরশাদবিরোধী আন্দোলন চাঙা হয়ে উঠেছিল। সেই চাঙাভাব কখনো হালকাভাবে কমলেও পুরোপুরি স্তিমিত আর হয়নি। ২৯ নভেম্বর ১৯৯০ থেকে মারাত্মক গরম হয়ে যায় পরিবেশ পরিস্থিতি। ৬ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৯০-এর সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ বা সেনাপ্রধান পদে অদল-বদল হয়েছিল; লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান স্বাভাবিক অবসরে যান এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরুদ্দীন খান দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে অস্থির পরিবেশ থাকলেও সেনাবাহিনীতে অস্থির পরিবেশ ছিল না, কিন্তু ক্রান্তিকালীন বা ট্রানজিশনাল পরিবেশ ছিল। কয়েক মাস আগে ইরাক কুয়েত দখল করেছিল এবং আশঙ্কা ছিল যে, আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী কুয়েত-সৌদি সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে। তাই পবিত্র ভূমি রক্ষার জন্য শুধু প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকার প্রয়োজন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি কনটিনজেন্ট সৌদি আরবে পাঠানো হচ্ছিল। সময়টা খুব ব্যস্ত যাচ্ছিল। মনের ভেতরে বা চিন্তার জগতেও ব্যস্ততা ছিল।

ধীরে ধীরে, একটু একটু করে সেনাবাহিনীর সব পর্যায়ে একটা মত বা ওপিনিয়ন দৃঢ় হচ্ছিল। মত বা ওপিনিয়নটি ছিল এই যে, সেনাবাহিনী এরশাদ সাহেবের শাসনকে দীর্ঘায়িত করায় আর অতিরিক্ত সহযোগিতা করবে না। কিন্তু একই সাথে জ্যেষ্ঠ মহলে অনুভূতি দৃঢ় হচ্ছিল যে, এরশাদ সাহেব চলে যাওয়ার পরপরই একটি সুন্দর নির্বাচনের প্রয়োজন হবেই হবে। ওই সুন্দর নির্বাচন সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নাও হতে পারে। সম্মানিত পাঠক, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আপনাদের এটাই বোঝাতে চাচ্ছি যে, ১৯৯০ সালের শেষাংশে, উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে, সেনাবাহিনী স্থিরচিত্তে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার কথা চিন্তা করছিল এবং অদূর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য করণীয় নিয়েও চিন্তা করছিল, কারো আহ্বান ব্যতীত স্বপ্রণোদিত হয়ে। চিন্তা মানে মনের ভেতরের কর্ম; দৃশ্যমান বা ধরাছোঁয়ার মতো নয়। এ রকম পরিস্থিতিতেই ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ করেছিলেন।

সামরিক ও বেসামরিক সহযোগিতার উজ্জ্বলতম উদাহরণ
’৯১-এর নির্বাচন উপলক্ষে যে নিয়মে সামরিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনী এবং সচিবালয়ে অবস্থিত নীতিনির্ধারক আমলাতন্ত্র ও মাঠে-ময়দানের আমলাতন্ত্রের মধ্যে যে নিয়মে পারস্পরিক ইন্টারঅ্যাকশন ও মেলামেশা হয়েছিল, সেটি ছিল প্রায় আদর্শ বা আইডিয়াল; সেটি ছিল সামরিক ও বেসামরিক সহযোগিতার উজ্জ্বল উদাহরণ। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০-এর তিন-চার দিন পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় আবেদন জানান, সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা ব্যতীত তিনি তার ওপর অর্পিত প্রধান দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। প্রধান দায়িত্বটি কী? সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা।

loading...

সামরিক বাহিনীর নিকট থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতাটি কী? সামরিক বাহিনী দেশব্যাপী মোতায়েন হবে এবং সামরিক বাহিনী মানুষের আস্থা অর্জন করবে, মানুষের মনোবল অটুট রাখবে, নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ উপহার দেবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন অবনতি না হয় তার নিশ্চয়তা দেবে। সামরিক বাহিনী অবশ্যই তাদের সুপ্রিম কমান্ডারের (দেশের প্রেসিডেন্ট) নির্দেশ পালনে বাধ্য। এটি সেনাবাহিনীর দায়িত্ব। কিন্তু কতটুকু আন্তরিকতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করবে, সেটি কোনো কাগজে লেখা ছিল না এবং কোনো কাগজে লেখা থাকেও না।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের বা ’৯১-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতৃত্বের অন্যতম অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব ছিল সেনাবাহিনীর সর্বস্তরের সব সদস্যের মনে নতুন অর্পিত দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে সর্বাধিক আন্তরিকতা সৃষ্টি করা। সব মহলের সার্বিক ইতিবাচক প্রচেষ্টায় ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচনটি সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ছিল। ভালো কিছু পেতে হলে কষ্ট করতে হয়। গৎবাঁধা প্রক্রিয়ায় ভালো কিছু না-ও আসতে পারে। তাই ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয় অনেক সময়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক জোট ও দলগুলো ১৯৯০-৯১ সালে এই বাস্তবতারই সাক্ষ্য স্থাপন করেছে।

গুণীজনদের কথা : মার্চ ২০০০
১১ মার্চ ২০০০ তারিখে ঢাকা মহানগরের আগারগাঁওয়ে অবস্থিত আইডিবি ভবনে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আলোচ্য বিষয়ের শিরোনামটি ছিল ‘নির্বাচনে নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নয়ন’। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, ডক্টর ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ, বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এককালীন সেনাবাহিনী প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম শওকত আলী, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও বর্তমান (২০১৭ শিক্ষামন্ত্রী) নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য পরে মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য পরে মন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দীন বীর বিক্রম, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান, ফেমা বা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের তৎকালীন মহাসচিব ফিরোজ এম হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক এবং পরে আইন কমিশনের সদস্য প্রফেসর এম শাহ আলম, বিমানবাহিনীর সদস্য অরাজনৈতিক ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুল হক, বিমান বাহিনীর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন খলিলুর রহমান, দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক এবং পরে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ্ আব্দুল হান্নান এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর আবদুুল লতিফ মাসুম।

আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো: আলী আশরাফ দাওয়াত পেয়েছিলেন, কিন্তু হজে গিয়েছিলেন, যাওয়ার আগে লিখিত বক্তব্য জমা দিয়ে যান। সেই আলোচনা সভায় (অর্থাৎ ১১ মার্চ ২০০০) কয়েকজনের বক্তব্য হুবহু উদ্ধৃত করছি পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলোতে।

ডক্টর ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ : ক। নির্বাচনকে সন্ত্রাস ও কালো টাকার প্রভাবমুক্ত করতে হলে এবং গণতন্ত্রকে জনকল্যাণমুখী করতে হলে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির আশ্রয়ে যেসব রাজনৈতিক বা রাজনৈতিক নামধারী ব্যক্তি আছেন তাদের মনোনয়ন রোধ করতে হবে। খ। ‘সৎ প্রার্থীকে নির্বাচিত করুন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির পৃষ্ঠপোষকদের প্রত্যাখ্যান করুন’- এ স্লোগান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে। সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ আন্দোলনটি সম্পূর্ণ দলমতনিরপেক্ষ হবে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সব সংস্থা ও সংগঠনকে নিয়ে আমরা এই স্লোগানের ভিত্তিতে একটি অভিযান পরিচালনার পদক্ষেপ নিতে পারি। যারা দলীয় রাজনীতির ভেতরে থেকে ভালো কাজ করতে চান, তাদের হাতকে আমরা শক্তিশালী করতে পারি বাইরে থেকে।

অধ্যাপক এম আলী আশরাফ : নির্বাচনী মওসুমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যকার সঙ্ঘাত কঠোরভাবে দমন করতে হবে। তা ছাড়া নির্বাচন কমিশনকে ঘোষণা দিতে হবে, যেন নির্বাচন কেন্দ্র অবৈধ অস্ত্র, কালো টাকা ও মাস্তানমুক্ত থাকে এবং তাদের ঘোষণা যেন বাস্তবায়িত হয়, এই মর্মে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর অন্যথা হলে সেটিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। নির্বাচনকালীন নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট অফিসারদের ওপর নির্বাচন কমিশন তাদের মনিটরিং আরো জোরদার করবে, কোনো প্রকার দুর্নীতির আশ্রয় তারা যেন নিতে না পারেন।

আগামী কলাম
আগামী কলামে সম্ভবত দুই সপ্তাহ পর বুধবারে আমরা পুনরায় কিছু গুণীজনের কিছু কথা মন্তব্যসহ তুলে ধরব এবং ২০১৮ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ততা সন্ধান করে নিজেদের চিন্তা নিবেদন করব। সেটিই হবে এই ধারাবাহিক রচনার শেষ কিস্তি।

loading...