বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য এবং সমালোচকদের সমুচিত জবাব

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। গত সাত বছরে বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্বিগুণ করেছে; সারা দেশের চাহিদার কাছাকাছি সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে সরকার। প্রতিশ্রুতি মতো ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়ে সরকার তার সাফ্যলের মুকুটে নতুন পালক যোগ করেছে। সমুদ্রসীমা নিয়ে মায়ানমারের সঙ্গে ফয়সালা করে নতুন জ্বালানি প্রাপ্তির দ্বার উন্মুক্ত করেছে এ সরকার। গত পাঁচ বছরে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কয়লার উত্তোলন বাড়িয়েছে পাঁচ হাজার টন। সরকারের দাবি, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতোগুলো সরকার এসেছে তার মধ্যে তারাই বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বেশি সফল। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, কিছু ব্যর্থতা থাকলেও বাংলাদেশের মতো সমমানের কোনো দেশ অল্প সময়ে এ দুটি খাতে এমন অর্জন দেখাতে পারেনি।


যদিও সমালোচকরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল এবং সম্প্রতি রামপাল বিতর্কে এ সরকারের সাফল্য কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশের চারটি খনি থেকে কয়লা উত্তোলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় জ্বালানি খাতেও সরকার আশানুরূপ ফলাফল অর্জন করতে পারেনি। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান সরকার যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করে তখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। অন্যদিকে গত ১২ জুলাই দেশে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৬৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। শতকরা হিসেবে গত পাঁচ বছরে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে ১০০ ভাগেরও বেশি। শেখ হাসিনার সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ পর্যন্ত চার হাজার ২৮২ মেগাওয়াট (ডিরেটেড) উৎপাদন ক্ষমতার ৫৬টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান মেয়াদে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নয় হাজার ৫৮৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৬৮টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। নতুন সাড়ে ৩৪ লাখ নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুতায়নের আওতায় ছিল ৪৭ ভাগ মানুষ যা বর্তমানে ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ২২০ কিলোওয়াট পার আওয়ার থেকে বেড়ে ২৯২ কিলোওয়াট পার আওয়ারে উন্নীত হয়েছে।তবে এসব অর্জন সত্ত্বেও রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিতর্ক এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে এ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে অনেক। তবে সরকারের বক্তব্য, বিদ্যুৎহীন থাকার চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিদ্যুৎ পাওয়াটা বেশি ভালো। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়তো। বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরাও বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা না হলে জিডিপির অর্জন দশমিক ৮ ভাগ কম হতো।


সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, যারা কাজ করেনি তাদের কোনো সমালোচনা হয় না। যারা কাজ করে তাদের সফলতাও থাকে, ব্যর্থতাও থাকতে পারে। বর্তমান সরকারকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে এর অর্থ তারা কাজ করেছে।বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের সময় ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১২টি, ২০১০-এ মাঝারি আকারের ১০টি, ২০১১ সালে ২২টি, ২০১২ সালে আটটি এবং এ বছরে এখন পর্যšত্ম দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এ বছরে উৎপাদনে আসা হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড় আকারের (৪১২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন)।



বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র আরো জানায়, গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি এখন কয়লায় বড় প্রকল্প নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে সরকার। ইতোমধ্যেই অনেক বিতর্কের পরেও রামপাল এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্র¯ত্মর স্থাপন করা হয়েছে।

সরকারের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী পিডিবি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ১৯ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে।বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা লক্ষ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পেরেছি। বিদ্যুৎ খাতে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এখন সরকার বড় প্রকল্পের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে।



তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে জ্বালানি। দেশের বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পেট্রোবাংলা সে অনুযায়ী গ্যাসের জোগান দিতে পারছে না। আবার কয়লার পাঁচটি খনি থাকা সত্ত্বেও কেবল একটি থেকেই উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এগুচ্ছে। তবে আমদানি করা কয়লা দিয়ে এসব প্রকল্প বা¯ত্মবায়ন কতোটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

loading...

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, বিদেশ থেকে তেল, গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি আমদানি করলে তার দাম অনেক বেশি পড়বে। এতে অমাদের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ সব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের পরই প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।অন্যদিকে বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় সফলতা হচ্ছে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ। মায়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ থাকায় এতোদিন বাংলাদেশ গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারছিল না। এ সরকারের সময়ে সে বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ায় অনুসন্ধানের পথ প্রশ¯ত্ম হয়েছে। সরকার এরই মধ্যে গভীর সমুদ্রের কয়েকটি ব্লক ভাগ করে নতুন মডেল পিএসসি (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট)-২০১২ ঘোষণা করেছে।

loading…


এছাড়া চাহিদা এবং উৎপাদনের মধ্যে ঘাটতি থাকার পরেও বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতেও আরো উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। দেশে এখন প্রতিদিন দুই হাজার ৩১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন হচ্ছে। আগের সরকারের সময়ে গ্যাস উৎপান হতো এক হাজার ৭১৩ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সঙ্গে কয়লার উত্তোলন পাঁচ হাজার টন বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসিকে নতুন সংযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে। রাজশাহী এবং ভোলায় গ্যাস বিতরণ শুরু হয়েছে। গ্যাস নেটওয়ার্কের আওতায় আসছে খুলনা বিভাগ। এদিকে সরকারের এই মেয়াদে বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।



জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, যথেষ্ট সরবরাহ বৃদ্ধির পরও ঘাটতি রয়েছে। তবে আমি একে জ্বালানি সংকট হিসেবে না দেখে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি।পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের সময় দেশের প্রায় সকল গ্যাস ক্ষেত্রে উৎপাদন বেড়েছে। দেশের বড় দুই গ্যাসক্ষেত্র তিতাস এবং বিবিয়ানা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিতাসে এখনো কূপ খনন করা হচ্ছে। তবে গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় সাগরবক্ষের একমাত্র ক্ষেত্র সাঙ্গুর উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছে।



তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস উৎপাদন আশানুরূপ বৃদ্ধি পেলেও ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে সংকটের সমাধান করতে সরকার সেভাবে কাজ করছে না। দেশের কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারেও সরকারের সফলতা নেই। বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করলেও তা খুবই সামান্য। এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ব্যাপারেও সরকার এগোতে পারেনি। তারা বলছেন, এখনই উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে।



আরও জানতে VIDEO টি দেখুন.চানেলটি SUBSCRIBE করতে ভুলবেননা PLEASE::

loading...