চালের দাম লাগামছাড়া ক্রেতাদের নাভিশ্বাস

সম্পুরক শুল্কে আটকে আছে চাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার নিয়ে খাদ্যমন্ত্রীর চিঠি এনবিআরে ঈদে ভিজিএফের চাল পাওয়া নিয়ে সংশয়

চালের বাজার অস্থির হচ্ছে ক্রমশই। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের উপর। বিশেষ করে বাড়তি টাকা খরচ করে চাল কিনতে গিয়ে নাভিঃশ্বাস উঠছে নিন্মবিত্তদের। কিন্তু দাম লাগামহীন ভাবে বাড়লেও এখন পর্যন্ত এই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। জানা গেছে, বেসরকারি আমদানিকারকরা সম্পুরক শুল্ক প্রত্যাহার ছাড়া চাল আমদানিতে উত্সাহী হচ্ছেন না। খাদ্যমন্ত্রী অবশ্য এই শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য দুই মাস আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছেন। তার মন্তব্য শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে আজ এমন পরিস্থিতি হতো না। তবে এনবিআর এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। কার্যত এই শুল্কে আটকে আছে চাল আমদানির বিষয়টি।

আবার চালের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। মিল মালিকেরা চাল দিতে পারছেন না বা দিচ্ছেন না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কারসাজিও আছে বলে অনেকে ধারনা করছেন। তবে সরকারি মজুদেও টান পড়েছে চালের। ঈদে এক লাখ টন চাল দুঃস্থদের দিতে আদেশ জারি হলেও তা বন্টন করা যাচ্ছে না গুদামে পর্যাপ্ত চাল না থাকায়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে দ্রুতই সবকিছুর সমাধান হবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারক সূত্রগুলো দাবি করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিনই বাজারে মোটা চালের দাম বাড়ছেই। অন্যান্য চালের দামও নিয়ন্ত্রণে নেই। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা ৫১ থেকে ৫২ টাকা, সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৫৪ থেকে ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর নতুন বোরো ওঠার পর যেখানে চালের দাম কমার কথা সেখানে উল্টো অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর হিসেবে গতকাল শনিবার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকায়। যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে মোটা চালের দামে রেকর্ড। মোটা চালের এই দাম গত এক মাসে ৮ শতাংশ বেড়েছে। বাত্সরিক হিসাবে এই বৃদ্ধির হার ৪৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্যান্য মানের চালের দামও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজারে বাজার করতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার হোসেন। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার চালের দাম বৃদ্ধিতে তিনি রীতিমতো হতাশ। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ দিন আগে যে মিনিকেট কিনেছিলাম ৫২ টাকা কেজিতে, তা এখন কিনতে হচ্ছে ৫৬ টাকায়। এভাবে চালের দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের ভোগান্তি বাড়তেই থাকবে।’

একই বাজারে চাল কিনতে এসে তার কষ্টের কথা জানালেন এক রিক্সাচালক। তিনি বললেন, এক কেজি মোটা চালের দাম ৪৮ টাকা। এক মাস আগেও তা ছিল ৪২/৪৩ টাকা। তিনি বলেন, সারাদিন রিক্সা চালিয়ে যে টাকা আয়-রোজগার করি। তার বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে চাল কিনতে। তাহলে সংসারের অন্যান্য খরচ কিভাবে চলবে?

কিন্তু কেন বাড়ছে চালের দাম? সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যায় ও দেশের কয়েকটি জেলায় ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে এবার বোরোর উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। এরসাথে যোগ হয়েছে বেসরকারি খাতে চাল আমদানি কমে যাওয়া। গত এক বছরে বেসরকারি খাতে মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। যেখানে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ দুই অর্থবছরে দেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ৩০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছিল। অনেকেই বলছেন চাল আমদানির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামও তাই মনে করেন। এ জন্য তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠিও দিয়েছেন দুই মাস আগে। তিনি আশা করেন সরকারিভাবে আমদানি করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা আগামী ২০ দিনের মধ্যে দেশে পৌঁছুবে। আর এ চাল আসলে দাম কমে যাবে।

অপরদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঈদে এক কোটি পরিবারের জন্য পরিবার প্রতি ১০ কেজি করে চাল দেয়ার আদেশ জারি করেছে। এই আদেশ প্রতি উপজেলায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু কোন গুদামে প্রয়োজনীয় চাল না থাকায় তারা তা দিতে পারছেন না। এ বিষয়ে অবশ্য খাদ্যমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে সরকারের গুদামে গত ৬ বছরের মধ্যে খাদ্যশস্যের মজুদ সর্বনিন্মে চলে এসেছে। খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সরকারের গুদামে ১ লাখ ৯১ হাজার টন চাল মজুদ রয়েছে। অথচ গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই সময়ে মজুদ ছিল ৬ লাখ ৯৬ হাজার টন। এরআগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯৭ হাজার টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫৮ হাজার টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৯ হাজার টন ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯ লাখ ৯৮ হাজার টন চালের মজুদ ছিল।

জানা গেছে, পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে নায্যমূল্যে ( ওএমএস) চাল বিক্রি করতে পারছে না। বর্তমানে সরকারের ওএমএস কর্মসূচিতে চাল বিতরণ বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগ নিচ্ছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। তারা বিভিন্ন অজুহাতে ইচ্ছামতো চালের দাম বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি মিল মালিকেরাও চাল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে খাদ্যমন্ত্রী বলছেন, ওএমএস দেওয়া হলে তা আবার ঘুরে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহে যোগ হবে। এ জন্য কিছু জায়গায় ওএসএম বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে ধানের উত্পাদন কম হওয়ায় চালের দাম বেড়েছে। এতে মিল মালিকদের কোন কারসাজি নেই। চালের অভাবে সমিতির অনেক চালকল বন্ধ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, অর্থাভাবে আমরা চাল কিনতে পারছি না। চাল যদি কিছু থেকে থাকে, তা ব্যবসায়ীদের কাছে আছে।

loading...

চালের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, চলতি বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উত্পাদন ১৫ থেকে ২০ লাখ টন কম হতে পারে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে এখন চালের সংকট নেই। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার দ্রুত ভিয়েতনাম থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানি করছে। এছাড়া থাইল্যান্ড ও ভারত থেকেও চাল আমদানি করা হবে। সবমিলিয়ে ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে। দ্রুত চালের দাম কমে যাবে বলে খাদ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন।

তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে চালের যে আমদানি শুল্ক রয়েছে তাতে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে আগ্রহী হচ্ছে না। কারণ ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্কসহ ব্যাংক ঋণ ও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি চালের দাম পড়বে ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা। তাই সরকারের আমদানি শুল্ক কমাতে হবে।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে হাওরে অকাল বন্যায় ও ব্লাস্ট রোগে ধানের উত্পাদন কম হয়েছে। এছাড়া সরকারের গুদামে চালের মজুদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা কারসাজির সুযোগ পেয়েছে। এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত দ্রুত চাল আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।

loading...